পরিবেশ দূষণ ও তার প্রতিকার
পরিবেশ দূষণ বর্তমান সময়ে বিশ্বের অন্যতম বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি মানব সমাজ, প্রাণীজগৎ এবং পৃথিবীর অস্তিত্বের জন্য এক মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠেছে। পরিবেশ দূষণ মূলত আমাদের দৈনন্দিন কাজের ফলে ঘটে এবং এটি আমাদের পৃথিবীকে অস্বাস্থ্যকর করে তোলে। দূষণের ফলে জীববৈচিত্র্য, মানব স্বাস্থ্য, জলবায়ু এবং অন্যান্য পরিবেশগত উপাদানগুলি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এভাবে, পরিবেশ দূষণ মোকাবিলায় কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার ।
১. পরিবেশ দূষণ কি?
পরিবেশ দূষণ বলতে আমরা পরিবেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিপর্যস্ত হওয়ার ফলে যে অবস্থা সৃষ্টি হয়, তাকে বোঝায়। এটি প্রধানত তিনটি ধরনের:
বায়ু দূষণ: কার্বন ডাইঅক্সাইড, সালফার ডাইঅক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইডের মতো ক্ষতিকর গ্যাসের বর্ধিত উপস্থিতি বায়ু দূষণের কারণ।
জল দূষণ: নদী, হ্রদ, সমুদ্রের জল দূষিত হয়ে মানুষের জন্য অযোগ্য হয়ে ওঠে।
মাটি দূষণ: রাসায়নিক সার, বিষাক্ত পদার্থ, প্লাস্টিক বর্জ্য মাটির স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
২. পরিবেশ দূষণের কারণ
পরিবেশ দূষণের পেছনে নানা ধরনের কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে প্রধান কারণগুলি হল:
আবর্জনা ও বর্জ্য পদার্থ: শিল্পকারখানার বর্জ্য, প্লাস্টিক বর্জ্য, এবং অন্যান্য অপচয় পদার্থ পরিবেশে দূষণ সৃষ্টি করে।
যানবাহনের আগ্রহীতা: অটোমোবাইলের সংখ্যা বাড়ানো, বিশেষ করে গাড়ির বিষাক্ত গ্যাস বায়ুতে মিশে বায়ু দূষণ সৃষ্টি করে।
কৃষি কার্য : অধিক মাত্রায় রাসায়নিক সার এবং কীটনাশক ব্যবহারের কারণে মাটি এবং জল দূষিত হয়।
বনভূমি ধ্বংস: বৃক্ষচ্ছেদন ও বনভূমির সংকোচন জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু ব্যবস্থায় বিপর্যয় ঘটায়।
৩. বায়ু দূষণ
বায়ু দূষণ আমাদের শ্বাসপ্রশ্বাসের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। গ্রীনহাউস গ্যাস, শিল্প কারখানা, গাড়ির ধোঁয়া, কৃষি থেকে সৃষ্ট ধোঁয়া, এই সমস্ত পদার্থ পরিবেশে নির্গত হয়ে বায়ু দূষণ সৃষ্টি করে। এর ফলে শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের রোগ এবং হৃদরোগের সমস্যা বৃদ্ধি পায়।
৪. জল দূষণ
জল দূষণের ফলে নদী, হ্রদ, সমুদ্র এবং অন্যান্য জলাশয়ের জল অস্বাস্থ্যকর হয়ে পড়ে, যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ, ফ্যাটি তেল, স্যুয়ারেজ বর্জ্য, বিষাক্ত গ্যাস মিশে জল দূষিত করে।
৫. মাটি দূষণ
মাটির মধ্যে মিশে থাকা রাসায়নিক পদার্থ, প্লাস্টিক বর্জ্য, পেস্টিসাইড মাটির স্বাস্থ্য নষ্ট করে। এই দূষণের কারণে কৃষিকাজও ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং খাদ্যশস্যের গুণমান কমে যায়।
৬. জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি
পরিবেশ দূষণের ফলে অনেক প্রজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। অরণ্যনাশ, জল দূষণ এবং অতিরিক্ত মানবীয় কর্মকাণ্ডে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী এবং উদ্ভিদ বিপন্ন হয়ে পড়ছে।
৭. জলবায়ু পরিবর্তন
বায়ু দূষণ এবং গ্রীনহাউস গ্যাসের আধিক্য পৃথিবীর জলবায়ুকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এর ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বরফ গলার এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণ হচ্ছে।
৮. স্বাস্থ্যগত সমস্যা
পরিবেশ দূষণের কারণে শ্বাসযন্ত্রের রোগ, হৃদরোগ, ক্যান্সার, ত্বকের রোগ, পেটের রোগ এবং আরো নানা ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা সৃষ্টি হয়।
৯. পরিবেশ দূষণের প্রতিকার
পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজন দৃঢ় পদক্ষেপ এবং সক্রিয় উদ্যোগ। কিছু প্রধান প্রতিকারপদ্ধতি নিচে দেওয়া হল
১০. পুনঃব্যবহার এবং পুনঃচক্রের ব্যবহার
বর্জ্য পুনঃব্যবহার ও পুনঃচক্রের মাধ্যমে পরিবেশে কম দূষণ ঘটানো সম্ভব। প্লাস্টিক, কাঁচ, ধাতু ও কাগজ পুনঃপ্রক্রিয়া করে এসব বর্জ্য থেকে নতুন পণ্য তৈরি করা যেতে পারে।
১১. সৌরশক্তি এবং নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার
প্রাকৃতিক শক্তি যেমন সূর্য, বায়ু, জলবিদ্যুৎ ইত্যাদি ব্যবহার করে তেল, কয়লা, গ্যাসের উপর নির্ভরশীলতা কমানো যেতে পারে, যা পরিবেশ দূষণ কমাতে সহায়তা করবে।
১২. পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ
ধূমপানবিহীন যানবাহন, সাইকেল এবং পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশের উপর চাপ কমানো সম্ভব।
১৩. গাছপালা রোপণ
বৃক্ষরোপণ পরিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গাছগুলি বায়ু থেকে কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণ করে এবং অক্সিজেন প্রদান করে, যা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য করে।
১৪. পরিবেশ আইন
সরকারকে শক্তিশালী পরিবেশ সংরক্ষণ আইন প্রণয়ন এবং তার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া শিল্পকারখানাগুলিকে পরিবেশ বান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারে বাধ্য করা উচিত।
১৫. সচেতনতা বৃদ্ধি
পরিবেশ দূষণ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে।
উপসংহার
পরিবেশ দূষণ শুধুমাত্র আমাদেরই ক্ষতি করছে না, এটি পৃথিবী এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্যও এক গুরুতর বিপদ। তাই আমাদের উচিত পরিবেশ সুরক্ষায় কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং সচেতনতার মাধ্যমে তা নিশ্চিত করা। মানুষের সচেতনতা, সরকারের নীতিমালা এবং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা পরিবেশ দূষণ কমিয়ে একটি সুস্থ এবং সবল পৃথিবী গড়ে তুলতে পারি।
প্রবন্ধ রচনা পেতে এখানে ক্লিক করুন
ছাত্রজীবনের দায়িত্ব ও কর্তব্য
আরো নতুন নতুন পোস্ট পেতে ক্লিক করুন
নিউটনের প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় গতিশক্তির ব্যবহার
চুম্বক কয় প্রকার ও তার ব্যবহার
তরলের চাপ বা আর্কিমিডিসের নীতি
আরো এরকম নিত্য নতুন পোস্ট পেতে আমাদের পেজটিকে ফলো রাখুন । এইখানে ক্লিক করুন
0 Comments