ছাত্র জীবনের দায়িত্ব ও কর্তব্য অনুচ্ছেদ । ছাত্র সমাজের দায়িত্ব ও কর্তব্য রচনা

 

প্রবন্ধ: ছাত্র সমাজের প্রধান দায়িত্ব ও  কর্তব্য


বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের ছাত্র সমাজ, সমাজের অগ্রগতির জন্য একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ছাত্ররাই দেশের ভবিষ্যত, সমাজের পরবর্তী নেতৃত্ব এবং সাংস্কৃতিক উন্নতির প্রধান চালিকাশক্তি। ছাত্র সমাজের প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য কেবল নিজেদের শিক্ষাজীবন সীমাবদ্ধ নয়, বরং ছাত্ররা দেশের উন্নয়ন, সমাজের ন্যায়বিচার ও সংস্কৃতির বিকাশ এবং সামাজিক সচেতনতার প্রসারে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। 


 ১. শিক্ষার প্রতি দায়িত্বশীলতা

ছাত্র-ছাত্রীর প্রথম এবং প্রধান কর্তব্য হলো শিক্ষার প্রতি দায়িত্বশীলতা পালন করা। ছাত্ররা মূলত তাদের পড়াশোনার মাধ্যমে নিজের ভবিষ্যত গড়ে তোলে। তারা যত বেশি পরিশ্রমী হবে, তত বেশি আত্মবিশ্বাসী ও দক্ষ হয়ে উঠবে। একজন ছাত্রের উদ্দেশ্য শুধুমাত্র পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জন করা নয়, বরং জ্ঞান অর্জন করা, মানসিক বিকাশ এবং সৃজনশীলতা বৃদ্ধি করা। এ জন্য ছাত্রদের দায়িত্ব হল শ্রেণীকক্ষে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, নিয়মিত পড়াশোনা করা এবং বিভিন্ন বিষয়ে আগ্রহী হয়ে বিশেষজ্ঞ হওয়ার চেষ্টা করা।


 ২. সমাজসেবায় অংশগ্রহণ

শিক্ষার পাশাপাশি ছাত্রদের সমাজসেবায় অংশগ্রহণ করতে হবে । সমাজে বিভিন্ন সমস্যা যেমন দারিদ্র্য, দুর্নীতি, অশিক্ষা, স্বাস্থ্য সেবা সংকট ইত্যাদি রয়েছে। ছাত্রদের কর্তব্য হল এসব সমস্যা সমাধানে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং সামাজিক কল্যাণে নিজেদের যুক্ত করা। ছাত্ররা বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতে হবে যেমন রক্তদান, বৃক্ষরোপণ, শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করা ইত্যাদি।


 ৩. জাতীয় দায়িত্ব

ছাত্র সমাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো দেশের প্রতি তাদের কর্তব্য পালন করা। একজন ছাত্রকে একজন আদর্শ নাগরিক হতে হবে, যে তার দেশের উন্নয়নে সহায়তা করবে। জাতীয় সংকটের সময়ে, যুদ্ধের পরিস্থিতিতে কিংবা দেশের বিপর্যয়ের সময় ছাত্ররা আগ্রহীভাবে নিজেদের কাঁধে দায়িত্ব তুলে নেবে। 

ছাত্র জীবনের দায়িত্ব ও কর্তব্য ।


৪. নৈতিকতা ও মূল্যবোধ

একজন ছাত্রের জন্য নৈতিকতা এবং মূল্যবোধের ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছাত্রদের মধ্যে দেশপ্রেম, সততা, মানবিকতা, সহনশীলতা, এবং সম্প্রীতির মূল্যবোধ তৈরি করা উচিত। সমাজে অশান্তি, বিশৃঙ্খলা, ও সহিংসতা বৃদ্ধি পেলে ছাত্র সমাজকে নৈতিক নেতৃত্ব দিতে হবে। তাদের উচিত শিক্ষা, চেতনা এবং সাম্যের কথা তুলে ধরতে হবে। ছাত্ররা যদি সমাজের সঠিক পথপ্রদর্শক হয়, তবে একটি আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে।


 ৫. সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের রক্ষা

ছাত্র সমাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হল দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষা করা। বর্তমান সময়ে আধুনিকতার নামে অনেক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি হারিয়ে যেতে বসেছে। ছাত্রদের উচিত দেশের ঐতিহ্যগত সংস্কৃতি সম্পর্কে জানানো এবং তা রক্ষা করা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন, পুরনো ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণা এবং সংস্কৃতি সংরক্ষণে সহযোগিতা করা ছাত্র সমাজের দায়িত্ব ও কর্তব্য হওয়া উচিত ।


৬. নেতৃত্বের ভূমিকা পালন

ছাত্র সমাজের একটি বিশেষ ভূমিকা হলো নেতৃত্ব প্রদানে সাহায্য করা। ছাত্ররা সমাজের বিভিন্ন স্তরে নেতৃত্ব দিতে পারে, যেমন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ গঠন, আন্দোলন সংগঠিত করা, বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগে নেতৃত্ব দেওয়া হল ছাত্র সমাজের দায়িত্ব । একজন ছাত্র নেতৃত্বের গুণাবলী যেমন সৎ, নিরপেক্ষ, এবং দূরদৃষ্টি সম্পন্ন হতে হবে। তারা শুধু নিজেদের জন্য নয়, বরং সমগ্র জাতির স্বার্থে কাজ করবে।


৭. বৈষম্য ও অসাম্য দূরীকরণ

 বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সামাজিক বৈষম্য এখনো অন্যতম দিক ধনী-দরিদ্রের পার্থক্য, নারী-পুরুষের সমান অধিকার, ধর্মীয় বা জাতিগত বৈষম্য—এসব সমস্যা ছাত্র সমাজকে প্রতিনিয়ত ভাবতে ও কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করছে। ছাত্র সমাজের দায়িত্ব হলো এই ধরনের বৈষম্য দূরীকরণে সক্রিয়ভাবে কাজ করা। প্রতিটি ছাত্রকেই বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে হবে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে।


৯. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

এখনকার যুগ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগ। ছাত্র সমাজের দায়িত্ব হলো নতুন নতুন প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের প্রতি আগ্রহী হওয়া এবং তা সমাজের জন্য ব্যবহারযোগ্য করতে কাজ করা। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার ও বিজ্ঞানচর্চায় ছাত্রদের নেতৃত্বের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নেওয়া । তারা যদি এই ক্ষেত্রে মনোযোগী হয়, তবে দেশে নতুন উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিগত উন্নতি হওয়া সম্ভব হবে।


১০. যুব সমাজের শক্তি ও সামগ্রিক উন্নয়ন

যুব সমাজ, বিশেষত ছাত্ররা, সমাজের শক্তিশালী ও উৎপাদনশীল অংশ। তারা যদি তাদের দক্ষতা, সৃজনশীলতা এবং আগ্রহ সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে, তবে তা জাতীয় উন্নয়ন ও পরিবর্তনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে। ছাত্রদের লক্ষ্য শুধু পড়াশোনা নয়, বরং তাদেরকে ভবিষ্যতের সৃজনশীল উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা , গবেষক, সমাজকর্মী, হিসেবে গড়ে তোলা। ছাত্রদের মধ্যে নেতৃত্ব গুণাবলী বিকাশের জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, কর্মশালা, ও সেমিনার আয়োজন করা উচিত। ছাত্ররা যদি নিজেদের মধ্যে সঠিক নেতৃত্ব গুণাবলী সৃষ্টি করতে পারে, তবে তারা সমাজের উন্নয়নমূলক কাজেও অংশ নিতে সক্ষম হবে।


১১. পরিবেশ রক্ষা 

বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো পরিবেশের দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন। ছাত্র সমাজের দায়িত্ব হলো এই বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং পরিবেশ রক্ষার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। বৃক্ষরোপণ, প্লাস্টিক ব্যবহার পরিহার, এবং সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে ছাত্ররা পরিবেশের সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণে অংশ নিতে পারে।


উপসংহার

সবশেষে, বলা যায় যে ছাত্র সমাজের দায়িত্ব শুধুমাত্র নিজের ভবিষ্যত গড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা সমাজের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠা, দেশকে উন্নতির পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, এবং সবার মঙ্গল নিশ্চিত করার জন্য কাজ করা। ছাত্রদের শিক্ষা, নৈতিকতা, সামাজিক দায়িত্ব, এবং রাজনৈতিক সচেতনতা তাদের ভবিষ্যত শুধু গড়বে না, বরং দেশের ও সমাজের উন্নয়নেও কার্যকর ভূমিকা রাখবে। ছাত্র সমাজের সেই মহান দায়িত্ব পালন করার মাধ্যমে দেশ আরো শক্তিশালী, কল্যাণকর এবং সাম্যপূর্ণ একটি দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।


প্রবন্ধ রচনা পেতে এখানে ক্লিক করুন


ছাত্রজীবনের দায়িত্ব ও কর্তব্য


প্রিয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম


বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ


বিশ্ব উষ্ণায়ন


মোবাইল ব্যবহারের সুফল ও কুফল


পরিবেশ দূষণ ও তার প্রতিকার


একটি গাছ একটি প্রাণ

বল ও গতি (Part -1)

আরো এইরকম বাংলায় রচনা ও ইংরেজিতে Letter writing পেতে পেজটিকে ফলো করো

আজকের বিষয়টি কেমন লাগলো তা কমেন্টে জানাতে ভুলো না।



 

Post a Comment

0 Comments