ধূমপানের ক্ষতি ফুসফুসকে
কিভাবে নষ্ট করে?
ধূমপান ফুসফুসের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর একটি অভ্যাস। যা শুধুমাত্র ফুসফুসকে সরাসরি প্রভাবিত করে না, বরং এটি শ্বাসতন্ত্র, রক্তনালী, এবং শরীরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলিকেও দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা সৃষ্টি করে। ফুসফুস হলো আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের মূল অঙ্গ। এটি অক্সিজেনকে রক্তের সাথে মিশিয়ে শরীরের প্রতিটি কোষে সরবরাহ করে এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড শরীর থেকে বের করে দেয়। কিন্তু ধূমপানের কারণে ফুসফুসের এই গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলি ব্যাহত হয়, যা ধীরে ধীরে শরীরের বিভিন্ন ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ধূমপানে উপস্থিত রাসায়নিক পদার্থগুলো
ধূমপানের ফলে শরীরে প্রচুর পরিমাণে ক্ষতিকর রাসায়নিক প্রবেশ করে। একটি সিগারেটে প্রায় ৭,০০০-এরও বেশি ক্ষতিকর পদার্থ থাকে, যার মধ্যে ৭০টিরও বেশি পদার্থ ক্যান্সার সৃষ্টিকারী হিসেবে পরিচিত। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কিছু রাসায়নিক হলো:
নিকোটিন : নিকোটিন হল এমন একটি আসক্তি সৃষ্টিকারী পদার্থ, যা মস্তিষ্কে দ্রুত পৌঁছে শরীরকে ধূমপানে অভ্যস্ত করে তোলে।
টার : টার হলো এমন একটি পদার্থ যা ফুসফুসের অভ্যন্তরে জমে গিয়ে বায়ুনালীর পথ আটকে দেয়, ফলে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।
কার্বন মনোক্সাইড : এটি রক্তের অক্সিজেন গ্রহণ ক্ষমতা কম করে, ফলে শরীরের টিস্যুগুলো অক্সিজেনের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ভলাটাইল অর্গানিক কম্পাউন্ডস (VOCs) : এইসব পদার্থ শরীরের কোষগুলির ডিএনএকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং ক্যান্সার সৃষ্টির ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে ।
ফুসফুসের গঠন ও কার্যপ্রণালী
ফুসফুস দুটি বড় আকারের পিন্ডের মতো অঙ্গ, যা বুকের দুইপাশে অবস্থিত। শ্বাস নেওয়ার সময় বায়ু ট্রাকিয়া বা শ্বাসনালীর মাধ্যমে ব্রঙ্কি এবং ব্রঙ্কিওল নামক ছোট নালীর মধ্যে প্রবেশ করে। এরপরে বাতাস অ্যাভিওলাই নামক ক্ষুদ্র আকারের গঠনগুলিতে যায়, যেখানে অক্সিজেন এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের আদান-প্রদান ঘটে। এই প্রক্রিয়াটি স্বাভাবিক অবস্থায় সহজ এবং কার্যকর হয়, কিন্তু ধূমপান এই প্রক্রিয়াকে ধীরে ধীরে নষ্ট করে।
ধূমপানের কারণে ফুসফুসের ক্ষতি
ধূমপানের ফলে যে প্রধান ক্ষতি হয় তা হলো ফুসফুসের টিস্যুর ধ্বংস। এটি বিভিন্ন ধরনের ফুসফুসের রোগের কারণ হতে পারে, যার মধ্যে অন্যতম হলো:
1. ক্রনিক ব্রংকাইটিস : ধূমপানের কারণে ব্রঙ্কির দেয়ালে প্রদাহ হয় এবং অতিরিক্ত মিউকাস উৎপন্ন হয়। এর ফলে বায়ু প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদি কাশি ও শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়।
2. এমফিসিমা : ধূমপানের কারণে অ্যাভিওলাইগুলি ধ্বংস হয়ে যায়। এটি এমন একটি অবস্থা তৈরি করে যেখানে ফুসফুসের টিস্যুতে স্থায়ীভাবে বাতাস আটকে যায় এবং শ্বাসপ্রশ্বাসে সমস্যা সৃষ্টি হয়। এমফিসিমা রোগীরা সাধারণত শ্বাস নিতে কষ্ট পান এবং দৈনন্দিন কাজ করতে তাদের সমস্যা হয়।
3. ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (COPD): এটি ক্রনিক ব্রংকাইটিস এবং এমফিসিমার সম্মিলিত একটি রোগ, যেখানে শ্বাসনালী সংকুচিত হয় এবং শ্বাসপ্রশ্বাসে বাধা সৃষ্টি হয়। ধূমপানই এই রোগের অন্যতম প্রধান কারণ হতে পারে ।
4. ফুসফুসের ক্যান্সার : ধূমপান ক্যান্সারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়। ধূমপায়ীদের মধ্যে ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি অন্যান্যদের তুলনায় ১৫ থেকে ৩০ গুণ বেশি। সিগারেটের ধোঁয়ায় থাকা বিভিন্ন কেমিক্যাল ডিএনএ-কে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং ক্যান্সারের কোষ তৈরি করতে সাহায্য করে।
শ্বাসতন্ত্রের অন্যান্য ক্ষতি
ফুসফুসের বাইরেও ধূমপান শ্বাসতন্ত্রের অন্যান্য অংশেও ক্ষতি করতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হলো:
ব্রংকোস্পাজম : ধূমপানের ফলে শ্বাসনালী সংকুচিত হয়, ফলে শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা দেখা দেয়।
অ্যাজমা : ধূমপান অ্যাজমার আক্রমণ বাড়িয়ে তোলে এবং তা নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন করে দেয়।
ফুসফুসের সংক্রমণ : ধূমপানের ফলে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, ফলে ফুসফুসে সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়, যেমন নিউমোনিয়া।
ধূমপানের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
ধূমপান শুধুমাত্র ফুসফুসকেই নয়, পুরো শরীরকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। তবে ফুসফুসে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সবচেয়ে প্রকট। নিয়মিত ধূমপানের ফলে ফুসফুসের টিস্যু নষ্ট হয়, এবং তা পুনরায় সেরে ওঠা সম্ভব হয় না। ফলে শ্বাস-প্রশ্বাসের ক্রমাগত অবনতি ঘটে এবং ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমে যায়।
১. ফুসফুসের কার্যক্ষমতার হ্রাস
ধূমপানের কারণে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা ক্রমশ কমে যেতে থাকে। ধূমপান চালিয়ে গেলে একটি সময় ফুসফুসের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ আর পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয় না। এর ফলে সাধারণ কাজকর্ম যেমন হাঁটা, সিঁড়ি বেয়ে ওঠা বা দৈনন্দিন কাজে কষ্ট হতে শুরু করে।
২. অকাল মৃত্যু
ধূমপানের ফলে ফুসফুসের ক্যান্সার বা COPD-এর মতো রোগে আক্রান্ত হলে, এটি জীবনের উপর চরম প্রভাব ফেলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি বছর ধূমপানের কারণে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করে। এর মধ্যে ফুসফুসের রোগে মৃত্যু হার সবচেয়ে বেশি।
ফুসফুস পুনরুদ্ধার: ধূমপান ত্যাগের উপকারিতা
ধূমপান ত্যাগ করার পর ধীরে ধীরে ফুসফুসের ক্ষতিগ্রস্ত কোষগুলো পুনরুদ্ধার হতে শুরু করে। যদিও ফুসফুসের সম্পূর্ণ সুস্থতা ফিরে পাওয়া যায় না, তবু ধূমপান ত্যাগ করার পর শ্বাস নিতে স্বাচ্ছন্দ্য আসে এবং শ্বাসতন্ত্রের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
তাজা বাতাসের প্রবাহ : ধূমপান ছেড়ে দিলে ফুসফুসে তাজা বাতাস প্রবাহিত হতে শুরু করে। এর ফলে শ্বাস নিতে সহজ হয় এবং শরীরের অক্সিজেন সরবরাহ ভালো হয়।
কফ এবং কাশি কমে যায় : ধূমপান ত্যাগ করার পর ব্রঙ্কিতে মিউকাসের উৎপাদন কমে যায়, ফলে কাশি এবং কফের পরিমাণ হ্রাস পায়।
ফুসফুসের সংক্রমণ প্রতিরোধ : ধূমপান বন্ধ করার ফলে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা পুনরুদ্ধার হয়, ফলে ফুসফুস সংক্রমণের ঝুঁকি কমে যায়।
অবশেষে বলা যায়
ধূমপানের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচতে এবং ফুসফুসকে সুস্থ রাখতে ধূমপান ত্যাগ করা অত্যন্ত প্রয়োজন ও খুব জরুরি। ধূমপান শুধু ফুসফুসের ক্ষতি করে না, বরং এটি শরীরের প্রতিটি অঙ্গকে নষ্ট করতে পারে। তাই ধূমপান ত্যাগ করে সুস্থ জীবনযাপনই সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত।
0 Comments