বায়ুমণ্ডলীয় চাপ: এর সৃষ্টি ও
উচ্চতার সাথে পরিবর্তনের ব্যাখ্যা
বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর চারপাশে ঘিরে রাখা গ্যাসের একটি আবরণ বা স্তর। এই স্তর আমাদের পৃথিবীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি পৃথিবীকে চাদরের মতো ঢেকে রাখে যা সূর্যের ক্ষতিকারক বিকিরণ থেকে রক্ষা করে এবং জীবজগতের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ও অন্যান্য গ্যাস সরবরাহ করে। বায়ুমণ্ডলের চাপ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা পৃথিবীর বায়ুর উপরে অভ্যন্তরীণ মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে সৃষ্টি হয়। এই চাপ বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন হতে পারে এবং এটি উচ্চতার সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়।
বায়ুমণ্ডলের চাপ কী?
বায়ুমণ্ডলের চাপ হল বায়ুর স্তরের ওজন, যা পৃথিবীর পৃষ্ঠে বা যে কোনো নির্দিষ্ট স্থানে ভারসাম্য রক্ষা করে। যখন আমরা মাটি বা সমুদ্রপৃষ্ঠে দাঁড়াই, তখন আমাদের মাথার উপর থেকে শূন্য কিলোমিটার পর্যন্ত যে গ্যাসের স্তর রয়েছে, তার সবগুলো গ্যাসের সামগ্রিক ওজন আমাদের উপরে চাপ তৈরি করে। এটি মূলত পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি দ্বারা সৃষ্ট।
বায়ুমণ্ডল বেশ কয়েকটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে যেমন
ট্রপোস্ফিয়ার, স্ট্রাটোস্ফিয়ার, মেসোস্ফিয়ার, থার্মোস্ফিয়ার এবং এক্সোস্ফিয়ার।
ট্রপোস্ফিয়ার পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০-১৫ কিমি পর্যন্ত বিস্তৃত এবং এখানেই পৃথিবীর বেশিরভাগ আবহাওয়া পরিবর্তন ঘটে। বায়ুমণ্ডল যত উপরের দিকে যায়, তার ঘনত্ব এবং চাপ কমে আসে। এর প্রধান কারণ হলো মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে নিচের স্তরগুলিতে গ্যাসের অণুগুলির ঘনত্ব বেশি থাকে, যা উপরের স্তরগুলির তুলনায় বেশি চাপ সৃষ্টি করে।
বায়ুমণ্ডলের চাপ কিভাবে সৃষ্টি হয়?
বায়ুমণ্ডল মূলত পৃথিবীর পৃষ্ঠে চাপ সৃষ্টি করে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে। পৃথিবীর গঠনগত অবস্থান এবং মাধ্যাকর্ষণ শক্তি বায়ুমণ্ডলকে ধরে রাখে এবং তা পৃথিবীর দিকে আকৃষ্ট করে রাখে। বায়ুমণ্ডলীয় গ্যাসের অণুগুলি পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ দ্বারা আকৃষ্ট হওয়ার ফলে মাটি বা সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছাকাছি আসা গ্যাসের অণুগুলির চাপ বাড়ে।
বায়ুমণ্ডলীয় চাপ সৃষ্টি করার প্রক্রিয়াটি বোঝার জন্য, এটি একটি ভারী বোঝার মত কল্পনা করা যেতে পারে, যা ধীরে ধীরে নীচে চাপ সৃষ্টি করছে। বায়ু নিজের ওজনের কারণে চাপ দেয় এবং এর চাপ সমানভাবে চারপাশের সকল দিকেই বিতরণ হয়। কিন্তু যেহেতু মাধ্যাকর্ষণ শক্তি নীচের দিকে টানে, তাই বায়ু যত নীচে নামে, তত তার চাপ বাড়তে থাকে।
ভূপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতার সঙ্গে বায়ুমণ্ডলীয় চাপের পরিবর্তন
বায়ুমণ্ডলীয় চাপ ভূপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতার সঙ্গে কমতে থাকে। উচ্চতার বৃদ্ধি ঘটলে বায়ুর ঘনত্ব কমে যায়, কারণ উপরদিকে বায়ুর স্তরগুলির ওপর প্রয়োগ করা চাপ কম থাকে। এর ফলে উপরদিকে গ্যাসের অণুগুলি একে অপরের থেকে দূরে সরে যায়, যা বায়ুমণ্ডলকে কম ঘন করে এবং সেই কারণে চাপও কমে যায়।
ট্রপোস্ফিয়ারে চাপের পরিবর্তন
বায়ুমণ্ডলের সর্বনিম্ন স্তর ট্রপোস্ফিয়ারে, বায়ুমণ্ডলীয় চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। ট্রপোস্ফিয়ারের উচ্চতা প্রায় ১০-১৫ কিলোমিটার, এবং এই স্তরের ওপরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা এবং বায়ুর চাপ দ্রুত কমতে থাকে। সাধারণত, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রতি ১০০০ মিটার (১ কিমি) উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বায়ুমণ্ডলীয় চাপ প্রায় ১০০ হেক্টোপাসকেল (hPa) বা ১ কিলোগ্রাম প্রতি বর্গসেন্টিমিটার কমে যায়।
উচ্চতায় বায়ুর অণুর সংখ্যা কম থাকে, ফলে অক্সিজেন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসগুলির ঘনত্বও কমে। এই কারণে উঁচু পর্বতে বা বিমান চলাচলের সময়, মানুষের শ্বাস নিতে অসুবিধা হয়। বিশেষ করে মাউন্ট এভারেস্টের মতো উচ্চতম শৃঙ্গে বায়ুমণ্ডলীয় চাপ এতটাই কম যে, শ্বাস নেওয়া অনেকের জন্য মারাত্মক হতে পারে।
স্ট্রাটোস্ফিয়ারে চাপের পরিবর্তন
ট্রপোস্ফিয়ারের উপরে স্ট্রাটোস্ফিয়ার রয়েছে, যা প্রায় ১৫-৫০ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত। এই স্তরে চাপ আরও কম থাকে এবং তাপমাত্রাও কিছুটা বৃদ্ধির প্রবণতা দেখায়, কারণ এখানে সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মি শোষিত হয়। যদিও বায়ুমণ্ডলীয় চাপ এখানে অত্যন্ত কম থাকে, তবে এটি ট্রপোস্ফিয়ারের তুলনায় বেশি স্থিতিশীল।
মেসোস্ফিয়ার, থার্মোস্ফিয়ার এবং এক্সোস্ফিয়ারে চাপের পরিবর্তন
স্ট্রাটোস্ফিয়ারের পরবর্তী স্তর মেসোস্ফিয়ার, যা ৫০ থেকে প্রায় ৮৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। এই স্তরে চাপ আরও কমে যায় এবং তাপমাত্রা দ্রুত হ্রাস পায়। এর উপরে থার্মোস্ফিয়ার এবং এক্সোস্ফিয়ার রয়েছে, যেখানে বায়ুমণ্ডলীয় চাপ অত্যন্ত ক্ষীণ। এই স্তরগুলি এতই পাতলা যে এখানে বায়ুর প্রায় অভাব রয়েছে। এক্সোস্ফিয়ার পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের শেষ স্তর, যেখানে গ্যাসের অণুগুলি এতটা দূরে থাকে যে তারা মহাশূন্যের সঙ্গে মিশে যেতে পারে।
বায়ুমণ্ডলীয় চাপের পরিবর্তনের ফলাফল
বায়ুমণ্ডলীয় চাপের পরিবর্তনের ফলে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ঘটে:
1. আবহাওয়ার পরিবর্তন: বায়ুমণ্ডলীয় চাপের পরিবর্তন সরাসরি আবহাওয়ার উপর প্রভাব ফেলে। নিম্ন চাপ সাধারণত বৃষ্টি, ঝড় এবং খারাপ আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়, যেখানে উচ্চ চাপ সাধারণত পরিষ্কার আকাশ এবং স্থিতিশীল আবহাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
2. পর্বত আরোহনের সময় চাপের প্রভাব: উচ্চতর পর্বতে ওঠার সময় বায়ুমণ্ডলীয় চাপ কমে যাওয়ায় মানুষের শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয়, যা উচ্চতার রোগ (altitude sickness) সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে মাথা ঘোরা, বমি ভাব এবং শ্বাসকষ্ট হতে পারে। তাই উচ্চ পর্বত আরোহনের জন্য প্রয়োজন হয় বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা।
3. বিমান চলাচল: বায়ুমণ্ডলীয় চাপের পরিবর্তন বিমান চলাচলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিমান উচ্চতায় চলাচল করলে চাপ কমে যাওয়ার কারণে কেবিনের মধ্যে বিশেষ চাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়, যাতে যাত্রীরা স্বাভাবিক শ্বাস নিতে পারেন।
4. জলবায়ুর প্রভাব: বায়ুমণ্ডলীয় চাপের পরিবর্তন জলবায়ুর উপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। এটি মহাসাগরের স্রোত এবং জলীয় বাষ্পের মাত্রা পরিবর্তন করতে পারে, যা বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ হতে পারে।
অবশেষে
বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর এক অবিচ্ছিন্ন অংশ, যা পৃথিবীর জীবজগতের জন্য অপরিহার্য ভূমিকা আছে । বায়ুমণ্ডলীয় চাপ একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, যা পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে সৃষ্টি হয়। উচ্চতার সঙ্গে সঙ্গে বায়ুমণ্ডলীয় চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয় এবং এর ফলে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন, পরিবেশ এবং আবহাওয়ার উপর বিভিন্ন ভাবে প্রভাব পড়ে।
0 Comments