পৃষ্ঠটান পদার্থবিজ্ঞানের
এক বিস্ময়কর গুণ
পৃষ্ঠটান বা সারফেস টেনশন (Surface Tension) হল পদার্থবিদ্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা তরলের পৃষ্ঠে বিশেষ ধরনের চাপ সৃষ্টি করে। এই চাপের কারণে তরলের পৃষ্ঠ ধ্বংস না হয়ে একটি শক্ত পৃষ্ঠের মতো আচরণ করে। পৃষ্ঠটান মূলত অণুগুলির পারস্পরিক আকর্ষণ শক্তির ফলে হয়ে থাকে, যা তরলের পৃষ্ঠকে অনেক ছোট করতে চায়।
পৃষ্ঠটানের সংজ্ঞা
পৃষ্ঠটান হল তরলের পৃষ্ঠের প্রতি একক দৈর্ঘ্যে যে বল প্রয়োগ করতে হয়, তাকে পৃষ্ঠটান বলা হয়।
সাধারণত পৃষ্ঠটানকে নিউটন প্রতি মিটার (N/m) এককে প্রকাশ করা হয়।
পৃষ্ঠটান কীভাবে কাজ করে?
তরলের অণুগুলো পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট থাকে, যা মূলত একে-অপরকে ধরে রাখার জন্য দায়ী। ভেতরের অণুগুলোর চারপাশে অন্যান্য অণু থাকে, যা তাদের একে-অপরের প্রতি টান বজায় রাখে। কিন্তু পৃষ্ঠের অণুগুলোর ক্ষেত্রে তাদের ওপরের দিকে কোনো অণু থাকে না। যার ফলে, তারা নিচের অণুগুলোর প্রতি বেশি টান অনুভব করে। এ কারণেই তরলের পৃষ্ঠটি একটি টান সৃষ্টি করে, যা পৃষ্ঠটান নামে পরিচিত।
পৃষ্ঠটানের কারণ
পৃষ্ঠটানের মূল কারণ হল তরলের অণুগুলির মধ্যে থাকা পারস্পরিক আকর্ষণশক্তি। তরলের ভিতরের অণুগুলি সব দিক থেকেই আকর্ষিত হয়, কিন্তু পৃষ্ঠের অণুগুলির জন্য আকর্ষণ শুধুমাত্র ভেতরের দিকে থাকে। ফলে পৃষ্ঠের অণুগুলি ভিতরের দিকে সঙ্কুচিত হয় এবং তরল পৃষ্ঠকে একটি সংকুচিত অবস্থায় রাখার চেষ্টা করে।
তরলগুলির মধ্যে পৃষ্ঠটানের পার্থক্য
বিভিন্ন ধরনের তরলের মধ্যে পৃষ্ঠটানের মান ভিন্ন হয়। উদাহরণস্বরূপ, জলের পৃষ্ঠটান তুলনামূলকভাবে বেশি, যা প্রায় ৭২.৮ মি. নিউটন/মিটার (25°C তাপমাত্রায়)। অন্যদিকে, অ্যালকোহলের পৃষ্ঠটান অনেক কম, যা প্রায় ২২.১ মি. নিউটন/মিটার
পৃষ্ঠটানের প্রভাব
পৃষ্ঠটানের ফলে আমরা বিভিন্ন দৈনন্দিন কাজ ও ঘটনা লক্ষ্য করি। যেমন:
1. জলের উপর পোকামাকড় হাঁটা : পৃষ্ঠটান এতটাই শক্তিশালী যে হালকা পোকামাকড় যেমন জল মাকড়সা জলের উপর চলাফেরা করতে পারে।
2. জলের ফোঁটা : জল বা অন্য কোনো তরলের ফোঁটা তার পৃষ্ঠটানের কারণে গোলাকার আকার ধারণ করে। কারণ, গোলাকার পৃষ্ঠ সবচেয়ে কম পৃষ্ঠক্ষেত্র বিশিষ্ট হয়।
3. কাঁচের উপর জল ছড়ানো : যদি কোনো পৃষ্ঠ হাইড্রোফোবিক হয় (যেমন তেল), তাহলে জল তার উপরে গোলাকার ফোঁটা আকারে থেকে যায়।
4. ক্যাপিলারি অ্যাকশন : সরু নল বা ছিদ্রের মাধ্যমে তরলের উপরে উঠে যাওয়ার প্রবণতাও পৃষ্ঠটানের সাথে যুক্ত।
5. বৃক্ষের জল শোষণ: গাছের শিকড় থেকে উপরের অংশে জল উপরের দিকে ওঠা এই প্রক্রিয়ায় পৃষ্ঠটান একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর মাধ্যমে জল পাতার দিকে পৌঁছায়।
বৃষ্টির ফোঁটার গোলাকার আকারের কারণ:
1. পৃষ্ঠটান: জলের কণাগুলির মধ্যে অভ্যন্তরীণ আকর্ষণের ফলে পৃষ্ঠটি সংকুচিত হয়। এই বল জলের ফোঁটাকে সবচেয়ে ছোট আকারে নিয়ে আসতে চায়, যাতে তার পৃষ্ঠ কম হয়। গোলাকৃতি সবচেয়ে কম পৃষ্ঠবিশিষ্ট আকার, তাই জলের ফোঁটাগুলি প্রাকৃতিকভাবে গোলাকার হয়।
2. মাধ্যাকর্ষণ: যখন ফোঁটাগুলি বড় হয়, তখন মাধ্যাকর্ষণ তাদের আকৃতি কিছুটা পরিবর্তন করতে পারে, বিশেষ করে যখন তারা পড়তে থাকে। তবে ছোট ফোঁটাগুলি প্রধানত গোল আকারের হয়ে থাকে।
পৃষ্ঠটান পরিমাপ
পৃষ্ঠটান পরিমাপের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি আছে, যেমন:
ক্যাপিলারি পদ্ধতি : এটি ক্যাপিলারি টিউবের মাধ্যমে পৃষ্ঠটান পরিমাপ করা হয়। তরলকে সরু নলে তোলা হয়, এবং সেই নলের উচ্চতা দেখে পৃষ্ঠটান নির্ণয় করা হয়।
ফোটা পদ্ধতি : একটি নির্দিষ্ট আকারের ফোটা তৈরি করে তার গাণিতিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে পৃষ্ঠটান নির্ণয় করা যায়।
পৃষ্ঠটানের বৈজ্ঞানিক কারণ:
পৃষ্ঠটান মূলত তরলের পৃষ্ঠে থাকা অণুগুলির মধ্যে আন্তঃআণবিক আকর্ষণশক্তির কারণে ঘটে। যখন তরলের অণুগুলি অভ্যন্তরে থাকে, তখন তারা চারদিক থেকে সমানভাবে আকর্ষণ পায়। কিন্তু পৃষ্ঠে থাকা অণুগুলির জন্য ওপরের দিকে আকর্ষণ থাকে না, কারণ সেখানে কেবল বায়ু থাকে। ফলে তাদের ওপর একটি অসম আকর্ষণ বল কাজ করে, যা পৃষ্ঠটান সৃষ্টি করে।
গবেষণা ও উন্নয়ন
বর্তমান গবেষণায় পৃষ্ঠটানের ওপর আরও গভীরভাবে আলোকপাত করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, জীববিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান এবং রসায়নের বিভিন্ন শাখায় পৃষ্ঠটান সম্পর্কিত গবেষণার মাধ্যমে নতুন নতুন উদ্ভাবন সম্ভব হচ্ছে। উদীয়মান ক্ষেত্রগুলিতে, যেমন ন্যানোটেকনোলজি, পৃষ্ঠটান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পৃষ্ঠটানের প্রভাব:
পৃষ্ঠটান অনেক দৈনন্দিন ঘটনার জন্য দায়ী। যেমন, ছোটো ছোটো কীট বা পোকামাকড় প্রায়ই জল বা অন্য তরলের পৃষ্ঠে হাঁটতে পারে। পৃষ্ঠটানের কারণেই তারা তরলের মধ্যে ডুবে যায় না। জলবিন্দু গঠিত হওয়ার পেছনেও পৃষ্ঠটান দায়ী।
একটি উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, যখন জল একটি পাতা বা মোমের ওপর পড়ে, তখন এটি ছোট ছোট গোলাকার বিন্দু তৈরি করে। এটি তরলের অণুগুলির মধ্যে পৃষ্ঠটানের কারণে হয়। তরলটি নিজের পৃষ্ঠটানকে সর্বাধিক করার চেষ্টা করে, ফলে এটি গোলাকার আকার গ্রহণ করে।
পৃষ্ঠটানের ব্যবহারিক প্রয়োগ
পৃষ্ঠটানের জ্ঞান বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়, যেমন:
1. ডিটারজেন্টের কাজ : ডিটারজেন্ট বা সাবান জলের পৃষ্ঠটান কমিয়ে দেয়, ফলে জল সহজেই ময়লা দূর করতে পারে।
2. ইনকজেট প্রিন্টিং : প্রিন্টারে তরল কালি ছোট ছোট ফোঁটায় পৃষ্ঠটানের সাহায্যে সঠিকভাবে কাগজের উপর প্রয়োগ করা হয়।
3. ওষুধশিল্প : বিভিন্ন ওষুধ তৈরিতে পৃষ্ঠটান কাজে লাগে, বিশেষত তরল ওষুধ তৈরির ক্ষেত্রে।
4. বুদবুদ : বুদবুদের স্থায়িত্ব এবং আকার পৃষ্ঠটানের উপর নির্ভর করে।
পৃষ্ঠটানের নিয়ন্ত্রণ
কিছু রাসায়নিক পদার্থ যেমন সাবান বা সারফ্যাক্ট্যান্ট, পৃষ্ঠটানকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। এই পদার্থগুলি তরলের অণুগুলির মধ্যে থাকা আকর্ষণশক্তি কমিয়ে তরলের পৃষ্ঠকে আরও নমনীয় করে তোলে। এর ফলে জলে মিশ্রণ সহজতর হয়।
পৃষ্ঠটান বিষয়ে অবশেষে বলা যায়
পৃষ্ঠটান একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য, যা তরল পদার্থের আচরণকে প্রভাবিত করে। দৈনন্দিন জীবনের অনেক ঘটনাই পৃষ্ঠটানের কারণে ঘটে, এবং বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর ব্যবহার অপরিসীম।
0 Comments